Gogol Ghoshal

Foodie. Writer turned Storyteller. Aspiring globetrotter.

ফ্রান্স - ২

বর্ডার পেরোনো তো মোলায়েম ভাবে হয়ে গেল। এবার ব্যাগেজ নিতে হবে। এটা প্যারিসের শার্ল দে গল এয়ারপোর্ট। আমার পরের ফ্লাইট ছাড়বে প্যারিসেরই আর এক এয়ারপোর্ট অর্লি থেকে। ঘন্টা তিনেকের লে-ওভার। সমস্যা হওয়ার কথা না।

খোঁজ নিতে হবে অর্লি যাবার সস্তা কিন্তু চটজলদি উপায় কোনটা। এয়ার ফ্রান্সের কোট পরা এক ভদ্রলোককে দেখে জানতে চাইলাম। ভদ্রলোক দেশি। বললেন এয়ারপোর্ট শাটল বাস সবচেয়ে সুবিধের উপায়। তার উপর পয়সাও লাগবে না। কানেকটিং ফ্লাইট বলে এয়ার ফ্রান্স থেকেই নাকি বাসের পাস দেবে। চমৎকার!

ওনার কথামতো টার্মিনাল থেকে বেরোনোর মুখে কাউন্টারে গিয়ে দাবি জানালাম। দিন মশাই কোথায় আমার ফ্রি পাস। শুনে, পাতি খেদিয়ে দিল! ভাবখানা - বিনামূল্যে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী, বাস পাস তো ভুলেই যাও।

কী গোলমেলে ব্যাপার! কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না বুঝে এয়ারপোর্টের বাসস্টপের দিকে হাঁটা দিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি বাসের টিকেট কাটার একটা দোকান মতো রয়েছে। দোকানে লাইন আছে, তবে মাত্র দুজন।

দুজন দেখে একটু হাঁপ ছেড়েছিলাম। ঠিক করিনি। আমার সামনের ভদ্রলোক একাই দশজনের সময় নিয়ে টিকেট কেটে চলেছেন। কেটেই চলেছেন। প্যারিস ডিসনিল্যান্ডের বাস টিকেট কাটবেন, তাই নিয়ে তার হাজারো প্রশ্ন। পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে? পরিবারের সবাই বাসে পাশাপাশি একসাথে বসতে পারবো? ওখানে গিয়ে ঘুরতে কত সময় লাগতে পারে? আজকের মধ্যে পুরোটা দেখতে পারবো? ফেরার শেষ বাস কখন ছাড়বে? তার টিকেট কি এখনই কেটে নিতে পারবো? আমি ওদিকে পিছনে দাঁড়িয়ে খালি উসখুস করছি। কয়েক বছর ক্যানাডায় থেকে অতি-ভদ্রতা অভ্যেস হয়ে গেছে, তাই তাড়া দিতেও পারছি না। শেষে অনেক গলা খাঁকড়ানো আর হাত উঁচিয়ে দোলানোর পর জিজ্ঞেস করা গেল, অর্লির বাসের টিকেট এখানেই পাব তো? নাকি তার আবার অন্য কোনো কাউন্টার? উত্তর পেলাম যে টিকেট কাটার কোনো গল্প নেই, সোজা গিয়ে বাসে উঠে পড়তে হবে। কোনো মানে হয়? ভুল তথ্যে খামোখা সময় নষ্ট!

গজগজ করতে করতে বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে দুটো জিনিস চোখে পড়লো। প্রথমটা হলো টিকেটের দাম স্পষ্ট লেখা আছে। মানে, হ্যাঁ, টিকেট কাটতে হবে - বাসে ওঠার পর। তবে তাই নিয়ে ভাবার ফুরসৎ পেলাম না, কারণ তার পরেই দেখলাম লেখা আছে বাস ছাড়বে প্রতি আধ ঘন্টা অন্তর। হাতঘড়ি আমি পরি না। পকেট থেকে মোবাইল বার করে দেখলাম ১২:০৩। কয়েক মিনিটের জন্য আগের বাসটা মিস করেছি। পরের বাস ছাড়বে সাড়ে বারোটায়।

দস্যু মোহন সিরিজের বই আমি একটাও পড়িনি, কিন্তু ছোটবেলায় তার গল্প শুনেছি। সেখানে টানটান উত্তেজনার মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠক চমৎকৃত হয়ে আবিষ্কার করতো, “হঠাৎ কী হইয়া গেল, মোহন পলাইল”। আমিও দুম করে টের পেলাম, হঠাৎ কী হইয়া গেল, আমার হাত থেকে সময় পলাইল।

আমার ফ্লাইট প্যারিসে সকাল ১১টার মধ্যে ল্যান্ড করার কথা ছিল। করেও ছিল তাই। কিন্তু তারপর গেট ফাঁকা না পেয়ে মিনিট পঁচিশ যে রানওয়ের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল - এইটা আমার হিসেবের মধ্যে ধরতেই ভুলে গেছি। তারপরেও হয়তো ১২টার বাসটা পেয়ে যেতাম, যদি না এদিক ওদিক টিকেটের খোঁজে সময় নষ্ট হতো। ওদিকে অর্লি থেকে ফ্লাইট ছাড়বে ২:১০ এ, ১:৫০ নাগাদ গেট বন্ধ হয়ে যাবে। গুগল ম্যাপস বলছে ট্র্যাফিক পেরিয়ে অর্লি পৌঁছতে এক ঘন্টার ওপর লাগবে। এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেক পেরোতে অন্তত মিনিট কুড়ি। অতএব…!

অতএব আমি ফ্লাইট মিস করবো। হা হুতাশ করে কোনো লাভ নেই। সবই মায়া! বরং ভাবি এখন কী করণীয়। এমনিতে কানেকটিং ফ্লাইট মিস হলে এয়ারলাইন্সই পরের ফ্লাইটে ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু আলাদা এয়ারপোর্ট হলেও করে কি? জানা নেই।

বাসে বসে বসে এইসব ভেবে চলেছি। একসময়ে দেখি হাইওয়েতে জ্যামে বাস আটকে আছে। রাস্তার ওইপাশে ছোট ছোট খুপরি বাড়ির ঘিঞ্জি বসতি। খুব একটা সুন্দর না। এটা প্যারিসের কোন অঞ্চল কে জানে? “Banlieue 13” সিনেমাটার কথা মনে পড়ে গেল। তাতে খানিকটা এইধরণের বাড়িঘর দেখেছিলাম। সিনেমার প্লটটা খাজা, কিন্তু চমৎকার parkour ছিল। নানারকম বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, লাফ মেরে, দেয়াল বেয়ে, সবচেয়ে তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছনোর পদ্ধতি হলো parkour. ছোটবেলা থেকে রোজ প্র্যাক্টিস করলে আজ আমাকে অসহায়ভাবে বাসে বসে থাকতে হতো না। অবশ্য সাথে লাগেজ আছে। অক্ষয় কুমার থাম্বস আপের বোতল হাতে নিয়ে করতে পারে, কিন্তু স্যুটকেস নিয়ে করা বোধহয় বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।

এসব হাবিজাবি কেন ভাবছি? মনে মনে নিজের কান মুলে দিলাম। এখন আমার তর্কের মহড়া দেয়া উচিত। এয়ার ফ্রান্সের থেকে যে করেই হোক পরের ফ্লাইটের টিকেট আদায় করতে হবে। কিন্তু তুলুস ছোট শহর, যদি আজ আর কোনো ফ্লাইট না থাকে? তাহলে খুব চেঁচামেচি করবো। আমার অবশ্য কাল পৌঁছলেও খুব একটা কিছু ক্ষতি নেই, কিন্তু সেটা ওদের জানতে দেব না। আজ আমার তুলুস না গেলে চলবেই না। তোমাদের অব্যবস্থায় সমস্ত বরবাদ হয়ে গেল! ওরা তখন কাচুমাচু মুখে বলবে খুবই দুঃখিত স্যার। আজকের রাতটা ৩-স্টার হোটেলে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমি নিমরাজি হয়ে বলব, সে নাহয় হলো, কিন্তু ডিনারের কী করছো?

ফন্দি আঁটতে আঁটতে অর্লি এয়ারপোর্ট চলে এলো। আমি ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে চেক-ইন কাউন্টারে গেলাম। দরাদরির দস্তুর হলো মাথা ঠান্ডা রাখা। দরকার হলে রেগে যাওয়ার ভান করতে হতে পারে, কিন্তু ওটা ভানমাত্র। আমি তাই শান্তভাবে শুরু করলাম, “এই দ্যাখো আমার এই ফ্লাইট। আমি এখন এসে পৌঁছেছি। কী করা যায়?”

“কী আবার করবে? ১০ মিনিটে গেট বন্ধ হবে। দৌড় লাগাও!”

কী পাজি রে বাবা! হোটেলের খরচা বাঁচানোর জন্য আমাকে ভাগ মিলখা বলে উস্কে দিলো। এদিকে আমি পিঠে ব্যাগ আর গালে দাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টের ভিতর দৌড় লাগাই, আর জঙ্গি সন্দেহে গুলি খাই আর কি! আজ্ঞে না।

অলিম্পিকে race walking বলে একটা জিনিস হয়। দেখেছ কখনো? দেখে নিয়ো। শিখেও নিয়ো। সাঁতারের মতোই দরকারি জিনিস। বিপদে আপদে খুব কাজে দেয়।

সিকিউরিটি চেক পেরোলাম যখন, তখন মোবাইল থেকে সময় দেখারও সময় নেই। উদ্ভ্রান্তের মতো ২ নাম্বার গেট খুঁজে চলেছি। মাথা কাজ করছে না। তীরে এসে তরী ডুবলো বলে।

হঠাৎ মনে হলো যেন “তুলুস” শুনতে পেলাম। আমার ঠিক সামনেই যে গেটটা ছিল সেখানে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, এই প্লেন কি তুলুস যাবে?”
“হ্যাঁ,…”
“মোয়া ওসি (আমিও)!! আই মিন… আমার টিকেট আছে। তুলুস। এয়ার ফ্রান্স।”

প্লেনে ঢোকার মুখে দেখি স্টিওয়ার্ড লজেন্সের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মাথাপিছু বোধহয় একটা বরাদ্দ, কিন্তু আমি খাবলা মেরে এক মুঠো তুলে নিলাম। হোটেল-ডিনারের লস্ টা লজেন্স খেয়ে উসুল করতে হবে। সবই কপাল!


(চলবে)


Archive